আবাহন pdf download link - কৌশিক পাল Abahan pdf by Kawshik Pal
অগস্টের প্রথম সপ্তাহ, রবিবারের আর-একটা সকাল
আজ সকাল থেকেই একটা হইহই ব্যাপার। ক্লাবের ছাদে চোঙা বাঁধা হয়েছে। চারদিকে মুখ করে চারটে। মিউনিসিপ্যালিটির জমাদার গদাধরদাকে ডেকে ক্লাবের আনাচে-কানাচে জমে থাকা ঝুল ঝাড়ানাে হচ্ছে। এর পর ভাল করে ঝাঁটিয়ে, ধােয়া হবে গােটা ক্লাবঘর। ক্লাবের। বিভিন্ন দেওয়ালে লাগানাে মান্ধাতার আমলের ছবিগুলােও পরিষ্কার করতে হবে। আজ সন্ধেবেলা যে এসপিএল-এর নিলাম! এসপিএল— শ্রীপল্লি প্রাইম লিগ! লাইভ অ্যান্ড এক্সক্লসিভ টেলিকাস্ট ফ্রম আওর ওন ক্লাবহাউজ!’ ক্লাবের বাইরের চাতালে মাউথপিস হাতে বসে, সেই কথাই অনবরত ঘােষণা করে চলেছে বান্টিদা। যা সরু তারের মধ্যে দিয়ে ছাদের চোঙা পর্যন্ত পৌঁছে ছড়িয়ে পড়ছে সারা পাড়ায়।
পাড়ার মান্যগণ্য অতিথিরা আজ আসবেন ক্লাবে। তাই তাদের জন্য প্লাস্টিকের খান পনেরাে চেয়ার নিতে এসেছি ‘গুল্লু-বিন্দু ডেকরেটার্স’-এ। গুল্লু আর বিন্দু কল্যাণদার দুই ছেলে, তাদের নামেই ব্যবসা। কল্যাণ ঘােষের দোকানটা আমাদের ক্লাবের খুব কাছেই। কল্যাণদার বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। লােকটা এমনিতে একটু খিটখিটে, মুখের ডগায় ‘হবে না’ কথাটা সর্বক্ষণ ঝুলে রয়েছে। তবে মনটা ভারী ভাল। এই যেমন আমাদের ফুটবল টুর্নামেন্টের কথা শুনে খুব খুশি হয়েছে। বলেছে, “যাক, বহুদিন পর পাড়ায় ভাল কিছু একটা হচ্ছে! ভাল, ভাল।
মুখে অনেকেই অনেক কিছুকে ভাল বলে, কিন্তু কল্যাণদা যে মন থেকে খুশি হয়েছে, সেটা বােঝা গেল তার পরের কথাতে, যখন জিজ্ঞেস করা হল, “চেয়ারগুলাের জন্য কত দিতে হবে গাে কল্যাণদা?”
কল্যাণদা তাঁর ছােট্ট অফিস ঘরের সামনে জলের ছিটে দিতে-দিতে বলল, “বিকেলে নিয়ে রাতে ফেরত দিবি তাে? ও কিছু দিতে হবে না। নিয়ে যা। কাজ হয়ে গেলে ফেরত দিয়ে যাস। তবে দেখিস, ভাঙাভাঙি করিস না যেন! তা হলে কিন্তু পাই-পয়সা বুঝে নেব।” তার পর গলা নামিয়ে হাতের ইশারায় আমাকে ডেকে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “তপনটা কী বলছে রে?” বললাম, “কিছু না, একটু গুম মেরে আছে। দু’দিন হল, ক্লাবে পা
রাখেনি।”
পাশ থেকে বিটু বলে উঠল, “তুমি আমাদের ফ্রি-তে চেয়ার দিচ্ছ শুনলে, ওর বাড়ির বিশ্বকর্মা পুজোয় কিন্তু প্যান্ডেল করে, চেয়ারটেবিল দিয়ে আর একটি পয়সাও পাবে না কল্যাণদা...”
কল্যাণদা ঠোট উল্টে বলল, “কত যেন দেয়! যাক, তােরা এখন যা, আমার আর মুখ খােলাস না। মেলা কাজ পড়ে আছে।”
“কল্যাণদা, টাকা যখন পাও-ই না, তখন তুমি কেন করাে ওর বাড়ির কাজগুলাে?” ছেলেমানুষের মতাে প্রশ্ন করল বিটু।
“ও তােরা বুঝবি না রে, ব্যবসাটা তাে চালাতে হবে। না হলে খাব কী? পার্টির কাজগুলাে তাে ওর সূত্রেই পাই। ধরে নিই, ওর বাড়ির কাজগুলাে আমার নজরানা!”
কল্যাণদার কথাগুলাে শুনে মনটা কেমন যেন করে উঠল। এখন আমার বিলুদার উপর খুব রাগ হচ্ছে, ও যে কেন এত কল্যাণদার পিছনে লাগে! শুধু বলে, ‘শ্রাদ্ধের প্যান্ডেল করার জন্য আমাদের কল্যাণদার জুড়ি নেই! সাদা কাপড় দিয়ে কী দারুণ গ্যারাজ ঘেরে!' এর পরের দিন করলে, আর কেউ না হােক, আমি বিলুদাকে বাধা দেব। ক্লাবে ফিরে দেখি, একতলাটার পুরাে ভােল বদলে গিয়েছে! এটা কি আমাদের ক্লাব? চিনতেই পারছি না! কোথাও সিগারেটের টুকরাে, পােড়া দেশলাইয়ের কাঠি পড়ে নেই। মেঝেয় পুরু ধুলাের স্তর নেই। কাগজের টুকরাে নেই। নেই, চি-বাদামের খালি প্যাকেট। কোনও দেওয়ালের কোণে কোথাও একটুও ঝুল ঝুলে নেই। সামান্য একটা পাড়া-ফুটবলকে কেন্দ্র করে আমাদের ক্লাবটা যে এমন নবকলেবরে। সেজে উঠবে, সেটা দেখে সত্যিই খুব আনন্দ হচ্ছে। কোনও একটা পজিটিভ কাজের কত অনুসারী এফেক্ট যে হতে পারে, তা যেন আমাদের আজকের এই ক্লাবঘরটিকে দেখেই বেশ বােঝা যাচ্ছে। | যদিও শান্তুদা এক হাতে ক্রাচ নিয়ে লেংচে-লেংচে এ-দিক ও-দিক করে বেড়াচ্ছে আর বলছে, “শালা, ওকে আমি ছাড়ব না। কত দিন পর একটা টুর্নামেন্ট খেলার সুযােগ এল আর দিল সব ভােগে পাঠিয়ে..”
আসলে সেদিন টুর্নামেন্ট নিয়ে আলােচনার সময় ক্লাবঘরে শান্তুদা একটা সােফায় বসে পা-টা ছড়িয়ে দিয়েছিল, উল্টো দিকে রঘুদারা যে সােফায় বসেছিল তার তলায়। বিখ্যাতকাকু আচমকা ঢুকে আসায় যখন রঘুদাদের সােফার পায়া ভাঙল, তখন তার তলাতেই চাপা পড়ে শান্তুদার পা। ভাগ্য ভাল, ব্যাপারটা শুধু বাম পায়ের উপর দিয়েই গিয়েছে! ভাঙেনি, জাস্ট হেয়ারলাইন ফ্র্যাকচার। তবে এই ‘ভাগ্য ভাল কথাটা বলায় আমাকে বেদম ঝাড় খেতে হয়েছে সকলের কাছে। ওদের বক্তব্য, “শান্তুর ভাগ্য ভাল হলে বিখ্যাতকাকু এই পাড়ায় নয়, অন্য পাড়ায় জন্মাত।
রঘুদা সৌজন্যদাকে বলেছিল, “হল তাে, হাতে-নাতে প্রমাণ পেলি তাে? শালা একেই প্লেয়ার কম, তার মধ্যে একটাকে শুরুতেই মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিল।”
সৌজন্যদা নিচু গলায় বলেছিল, “তিন জনের সােফায় তােরা সাত জন বসলে ওই ভদ্রলােকের কি আর বিশেষ কিছু করার প্রয়ােজন আছে রে?”
“তুই শালা এখনও বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছিস না। এর পর যেদিন নিজে বাম্বু খাবি ওই মালটার জন্য, সেদিন বুঝবি,” বেশ রেগে গিয়েই কথাগুলাে বলেছিল বিলুদা।
সে কথায় পাত্তা না দিয়ে সৌজন্যদা একটা চোখ টিপে বলেছিল, “তা হলে নিলামের দিন ক্লাবে আসার জন্য তােদের বিখ্যাতকাকুকে আলাদা করে ইনভাইট করব না বলছিস?”
“এই বিষয়টাকে নিয়ে চ্যাংড়ামাে করিস না ভাই... ওই একটা মানুষ কিন্তু একা সব ভেস্তে দিতে পারে!” ধরা গলায় বলেছিল রঘুদা।
বইটি ডাউনলোড করতে এখানে ভিজিট করুন।
Tags
Kawshik Pal
