আসামী হাজির - বিমল মিত্র Asami Hazir pdf by Bimol Mitra

আসামী হাজির - বিমল মিত্র Asami Hazir pdf by Bimol Mitra boi download


সত্যকে দেখার এবং সেই সত্যের সামাজিক ও ব্যক্তিগত বাস্তব রূপ তুলে ধরার ক্ষমতা শ্রেষ্ঠ শিল্পীর লক্ষণ সন্দেহ নেই কিন্তু সংকটের সত্যকে টুকরো টুকরো করে দেখলে সংকটের পূর্ণ চেহারা যেমন দেখা যায় না, তেমনি, Positive good man. যাকে কেন্দ্র করে সংকট প্রকট হয়ে ওঠে তাকেও সম্পূর্ণ করে পাওয়া যায় না। লেখকের শ্রেষ্ঠত্বের আর এক প্রমাণ এই তাত্ত্বিক সত্য তাঁর শুধু জ্ঞাতই নয়, এর স্বরূপও তাঁর অনায়াস-আয়ত্ত। তাই তো তিনি সদানন্দর মাধ্যমে স্তরে স্তরে বিন্যস্ত সামাজিক সংকটের জটিল রূপটি সামগ্রিক ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। আর সামাজিক সংকট সামগ্রিক ভাবে ফুটে ওঠার দরুন সদানন্দ চরিত্রও স্বচ্ছন্দে স্বতঃই পূর্ণবিকশিত হয়ে উঠতে পেরেছে।
এই যে যুগপৎ চিত্র ও চরিত্র আঁকা, এ এক দুর্লভ গুণ। লেখক আমাদের সামনে যুগসংকট তুলে ধরতে চান; কিন্তু কী ভাবে? যুগসংকটকে আমরা নিজেরাই কি দেখতে চাই যে কেউ দেখালেই দেখব? দৈনন্দিন জীবনে এত অসংখ্য অন্যায় আমরা দেখছি আর ভুগছি যে আমাদের বোধশক্তিটাই ভোঁতা হয়ে গেছে, চোখে পড়ে গেছে চালশে। এখন আর কোন অসঙ্গতিই আমাদের চোখে পড়ে না, কোন মর্মান্তিক ঘটনাই আর দাগ কাটে না আমাদের মনে। অতএব লেখককে আনতে হয়েছে এমন একজন মানুষকে যে এই সমাজ-সংসারে একেবারেই আগন্তুক। আগন্তুকের চোখে সবই ধরা পড়ে। অথচ আগন্তুক যেহেতু এই সমাজ-সংসারের সুখ-দুঃখের শরিক নয় তাই সে সব কিছু দেখবে খোলা চোখে সাদা মনে, নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে। তাই তার সেই দেখায় কোথাও গাম্ভীর্য বা গুরুত্ব নেই। থাকলেও Positive good man যেহেতু রাজনীতি বোঝে না, তার চোখের দেখা দুরূহ ব্যাপারগুলোও তখন আর গুরুভার হয় না। কৌতুকে-শ্লেষে মিলে মিশে এক উপাদেয় রসবস্তু হয়ে ওঠে, যার নাম দেওয়া যায় grotesque beauty. পাঠক লক্ষ্য করবেন, এই শ্লেষ ও কৌতুক মেশানো রচনার grotesque beauty শুধু নায়ক সদানন্দর মধ্যে নয়, গ্রন্থের সর্বত্র সমস্ত চরিত্র ও ঘটনার মধ্যেই সুক্ষ্মভাবে বিরাজমান।
তবে কি শুধু কৌতুকে বিদ্রুপে আমাদের এই যুগসংকটের অন্ধকারটাকেই প্রকট করার জন্যে positive good man-এর মাধ্যম ব্যবহার? না । তমসো মা জ্যোতির্গময়ো—উপনিষদের এই প্রার্থনাই লেখকের শিল্প-প্রেরণা। positive good man- এই আলোরই প্রদীপ। যুগ- সংকটেই এদের আবির্ভাব ঘটে। এরা এলেই সংকটের সামগ্রিক চেহারাটা আমাদের সামনে প্রকট হয়, আমরা শিউরে উঠি, আমরা আলোতে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রার্থনায় নতজানু হই। আর সেই তো আমাদের পরিত্রাণ।
শ্বশুরের লালসাকে ধিক্কার দিয়ে, তাঁর মর্যাদার মুখোশটাকে খুলে জনতার সামনে দু'পায়ে থেঁতলে দিয়ে নয়নতারা তার স্বামীর ভিটে জন্মের মতন ছেড়ে এসেছিল বটে কিন্তু সেই থেকে তাকে হতে হয়েছিল পরস্পরবিরোধী দুই প্রবণতার শিকার। অসুস্থ সদানন্দকে রাস্তা থেকে বাড়িতে কুড়িয়ে এনে নয়নতারা তাকে প্রাণপাত সেবা করে এবং তজ্জনিত লাঞ্ছনা সয়ে তাকে সুস্থ করে তোলে অথচ সে নিজে তখন নিখিলেশের স্ত্রী। নিখিলেশ ততদিনে তাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে, তাকে অফিসে চাকরি পাইয়ে দিয়েছে। নিখিলেশ তাকে তার অসহায় অবস্থা থেকে রক্ষা করেছে। সে তাই নিখিলেশকে ভালবাসে। কিন্তু সদানন্দকে?....
সদানন্দ নয়নতারাকে অপ্রত্যাশিত ভাবে বিপুল অর্থ দিয়েছিল বটে কিন্তু সে কি নয়নতারা তাকে রোগে সেবা করেছিল বলে? কিম্বা সে কি নয়নতারাকে সে বিনা দোযে ত্যাগ করেছিল বলে? নাকি ...
ফাউস্টকে বাজী রেখেছিলেন ঈশ্বর। শয়তান বলেছিল, এই পৃথিবীকে আমি বাড়ি গাড়ি নারী সম্পদ আর খেতাব খয়রাত্ দিয়ে দখল করে ফেলেছি, বাভিচার যুদ্ধ আর মহামারী ছড়িয়ে মানুষদের এমন কোণঠাসা করে রেখেছি যে, সবাই আমাকে ষোড়শোপচারে পূজো করছে। অতএব এই দুনিয়াদারী আমার। ঈশ্বর বললেন, তুমি যদি ওই পবিত্র-প্রাণ ফাউটের আত্মাকেও আয়ত্ব করতে পারো, নিভিয়ে দিতে পারো তার বুক থেকে প্রেমের দীপশিখা তবেই স্বীকার করব এই পৃথিবী তোমার। শয়তান ফাউটের আত্মা কিনে নিয়েছিল, তাঁকে ভোগ সুখ ও জগতের যাবতীয় বিলাস-ব্যসনের মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু ফাউসট তাঁর প্রাণের সেই প্রেমের দীপশিখাটি কিছুতেই নিভতে দেন নি। শেষ পর্যন্ত তাই ফাউটেরই জয় হল। শয়তান আর পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিপতি হতে পারল না।
ফাউটের সেই পবিত্র প্রেমের শিখাটিই বুঝি দু'চোখের দৃষ্টি-প্রদীপে ধরে পৃথিবীর অন্ধকার পায়ে পায়ে পার হয়ে সদানন্দও তার লক্ষ্যস্থলের দিকে হেঁটে চলছিল। আর ওদিকে তখন কলকাতার অভিজাত পল্লী থিয়েটার রোডের এক সুরম্য সৌধে পড়ে-পাওয়া বিপুল অর্থে কেনা সুখের কুষ্ঠ-ব্যাধিতে ভুগছিল নয়নতারা।
দিব্য প্রেমের পবিত্র আলোটি নিয়ে আজ থেকে এক হাজার ন'শ তিয়াত্তর বছর আগে পৃথিবীতে এসেছিলেন প্রথম Positive good man. তিনিও ওই সদানন্দর 'এতই পৃথিবীর পথে পথে সেদিন হেঁটে চলেছিলেন। তিনিও মানুষের কল্যাণই চেয়েছিলেন। মানুষের কল্যাণের জন্যে তিনি তাঁর সারা জীবনের তপস্যার ফল মানুষকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। সে-তপস্যার ফল মানুষের কী কী কল্যাণ করেছে সদানন্দর মতন তিনিও তা দেখতে বেরিয়েছিলেন তখন। হাঁটতে হাঁটতে একদিন তিনি সেদিনের থিয়েটার রোডের এক সুরম্য সৌধে গিয়ে উপস্থিত হলেন। রাজকীয় উৎসবে সেখানে তখন ফরিশীয় পুরোহিতরা সকলে উপস্থিত—দীয়তাং ভূজ্যতাংএর রব উঠছে চারদিকে। হঠাৎ তারই মধ্যে এক ছন্নছাড়া ছিন্নবাস মানুষের উপস্থিতি যেন সব কিছু হঠাৎ তছনছ করে দিলে। কেউ তাঁকে সহ্য করতে পারলে না, কেউ তাঁকে স্বীকার করতেও চাইলে না—এমন কি নয়নতারাও না। কেবল সমবেত পাপের হিংস্র ক্রোধ মুষ্টিবদ্ধ হয়ে ছুটে এল তাঁর দিকে—তাঁকে রক্তাক্ত করে ছাড়ল। নিহত মানুষটির সেই রক্তে স্নান করে তখন পবিত্র হল নয়নতারা। নয়নতারার সুখের কুষ্ঠব্যাধি মিথ্যের খোলসের মতন সেই মুহূর্তেই খুলে পড়ল তার শরীর থেকে। প্রেমে জ্যোতিষ্মতী হয়ে উঠল সে। পাপের পাথর চাপা সত্য তখন মুক্তি পেল কণ্ঠে নয়নতারা নির্দ্বিধায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করল – ইনি আমার স্বামী'।
-
কিন্তু একালের যীশু তখনও চিৎকার করে বলে চলেছে— 'আমি তোমাদের মতন হতে পারি নি, তোমরা আমার সেই অক্ষমতার বিচার কর, তোমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে না পারার অপরাধের বিচার কর। আমি আসামী, আমি হাজির হয়েছি।'
অনুরূপ আর এক কণ্ঠস্বর শুনি আমরা ইয়োনেসকোর “গণ্ডার” নাটকের নায়কের মুখে—"I'm the last man leit, and I'm staying that way until the end. I'm not capitulating."
বিমল মিত্র তাঁর এই উপন্যাসে যে বিশাল জগৎ সৃষ্টি করেছেন তার প্রতিটি ঘটনা এবং 'প্রতিটি চরিত্র এমনই বিশ্বাসযোগ্য ও হৃদয়গ্রাহী যে আমরা আমাদের অজ্ঞাতসারেই এই জগতের সামিল হয়ে যাই কিংবা কখন যেন, কেমন করে যেন, এ জগৎ আমাদেরই জগৎ হয়ে ওঠে। সব কিছুর মধ্যে এখানে আমরা তামাদের নিজেদেরই দেখতে পাই, আমরা অবহিত হয়ে উঠি। আর এমন করে যিনি আমাদের আত্ম-অবহিত করে তোলেন, নিঃসন্দেহে তিনি আমাদেরই লেখক, আমাদের প্রিয় লেখক।

বিমল মিত্র এর pdf book আসামী হাজির pdf download করুন এখান থেকে। 

Post a Comment

Previous Post Next Post