এক্কা দোক্কা - শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় Ekka Dokka pdf by Shirshendu Mukhopadhyay
হাই! আমি নহুষ।
আমি এখন এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। পা দুটো বুকের কাছে জড়ো করা, হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে থুতনির নীচে। আমার চোখদুটো বোজা, আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না। দেখার কিছু নেইও। তবে আমি একটা শব্দ শুনতে পাই, ধুকপুক ধুকপুক। ওটা আমার মায়ের হার্টবিট। আমি বেশ আছি, আরামে। খিদে তেষ্টা নেই। শীত বা গরম নেই। একটা ওম আছে। আমি একজন বিজয়ী। একটা মাতৃগর্ভের জন্য কি ভীষণ হুড়োহুড়ি! কত জন যে ছুটেছিল, কে আগে পৌঁছবে বলে! তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম এক দৌড়বাজ। জঠরে সবাই আমরা জড়ো হয়ে ডোরবেল বাজিয়েছিলাম, দরজা খোলো, দরজা খোলো! কী ভীষণ আশা ও হতাশায়। একটা লটারি খেলা তো! কে যে সুযোগ পাবে! কত যে উৎকণ্ঠা! অবশেষে অপ্রত্যাশিত ভাবে আমার দরজা গেল খুলে। তার পর থেকে এই আমার ঘরদোর, এই আমার অঙ্কুরিত হয়ে ওঠার জায়গা।
বড় সুন্দর একটা সিক্ত, নরম, মায়াবী অন্ধকার প্রকোষ্ঠ। জন্ম কি সোজা! কত বার যে বিফল হতে হয় তার ইয়ত্তা নেই। কত মাতৃগর্ভের প্রত্যাখ্যান সইতে হয়েছে তার হিসেব নেই। বারবার নষ্ট হয়ে গেছি। অনেক ব্যর্থতার পর এই একটা সাকসেস। জন্ম যে কত কষ্টের তা যদি মানুষ জানত তা হলে আর মরতে চাইত না। আমি এখন মাতৃগর্ভে।
ভারী শান্তিতে ছিলাম। নিস্তরঙ্গ, চিন্তাহীন, লম্বা ঘুমে। একটু আধটু পাশ ফিরতাম কখনওবা, একটু হাত পা ছুড়তে ইচ্ছে হত। তার পর হঠাৎ এক দিন একটা ওলটপালট শুরু হয়ে গেল। বড্ড বিরক্তিকর। আমার ছোট্ট ঘরখানা যেন ভাড়াটে বিদেয় করতে পারলে বাঁচে। কে যেন তাড়া দিয়ে বলছে, ওঠো! ওঠো! সময় হয়েছে, এ বার যে বেরিয়ে পড়তে হবে! ঠেলেঠুলে আমাকে কোন অচেনায়, কোন অজানায় যেন পাঠিয়ে দিতে চাইছে! কিন্তু আমি তো আর কোথাও যেতে চাইছি না! এই তো বেশ আছি, এ ভাবেই কেন থেকে যাই না!
কিন্তু না, আমাকে উল্টেপাল্টে, ধাক্কা দিয়ে আমার কবোষ্ণ ঘরটি থেকে কে যেন তাড়িয়ে দিচ্ছে, কিছুতেই তিষ্ঠোবার উপায় নেই। অবশেষে আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমাকে এক পিছল গুহাপথ দিয়ে বেরিয়ে আসতেই হল এক আশ্চর্য জগতে। আলো আর আলো! চোখ ঝলসে গেল আমার, হাত পা হঠাৎ যেন বন্ধনমুক্ত হয়ে ড্যাং ড্যাং করতে লাগল, আমি তো হাত পায়ের ব্যবহারই জানি না! আর আমার সেই আরামের কোলকুঁজো অবস্থা থেকে কেমন একটা অনিশ্চয়তায়, নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে গেলাম আমি। আমার ঘর কই? আমার সেই নিশ্চিন্ত ঘুম কোথায় গেল? এ আমি কোথায় এলাম? তারস্বরে কেঁদে উঠলাম আমি।
সেই আমার প্রথম কান্না।
যখন পরিষ্কার করা হচ্ছিল আমায়, তখন কী যে ব্যথা আর বেদনা। কত যে প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম আমি! কেউ পাত্তা দেয়নি। তার পর ঢাকাঢুকি দিয়ে কে যেন কোলে তুলে নিল আমায়। মুখে মাতৃস্তন্য। এই প্রথম জিহ্বায় কোনও স্বাদ পেলাম আমি। সে এক আশ্চর্য স্বাদ! তার পর ঘুম আর ঘুম।
একটা লাল বল গড়িয়ে যাচ্ছে মেঝের ওপর দিয়ে, আমি প্রবল হামা দিয়ে সেটাকে ধরতে যাচ্ছি। মেঝে থেকেই একটা টিকটিকি মাথা তুলে দেখল আমাকে, পুঁতির মতো চোখ। না আমি তাকে ভয় পাই না, হাত বাড়াতেই টিকটিকিটা সুভূত করে উঠে গেল দেয়ালে। বলটা গড়িয়ে গেল খাটের নীচে। খাটের নীচে অন্ধকার, আমি অন্ধকার ভয় পাই।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের এক্কা দোক্কা Ekka Dokka pdf Download করুন এখান থেকে।
