গোলপোর্কের পুরনো বইয়ের দোকোনগুলোর একটার সামনে দাঁড়িয়ে মিতুল প্রায় চিৎকোর করে উঠল। “মা, মোা, দেখো কী ভাল কনডিশন। আর সন্দুর করে বাঁধানো। মা প্লিজ কিনে দাও!” চমন দেখল মিতুল আনন্দে লোফাচ্ছে। আর তুতুল তত ক্ষণে দিদির অনুসারী হয়ে ছো মেরে তুলে নিয়েছে অমর চিত্র কথা-র বাধানো সেটটা। একটা ছোট তক্তপোশের ওপর সাজানো অনেক বইয়ের মাঝখানে পাতা-খোলা বইটা ছিল। মিতুলের ঠিক নজর পড়েছে ওটার ওপর। দোকানদারও টুল থেকে উঠে এগিয়ে এসেছে হাতের সিগারেটটা ফেলে দিয়ে, “একশোটা বোঁধানো। আর টপ-টপ সব গল্পগুলোই রয়েছে, দেখুন।” দোকানদার চমনকে দেখছে না, তার বৌ মিত্রার দিকে তাকিয়ে কথা বলছে, “হাতে চোঁদ পোওয়োর মতো ব্যাপার দিদিভোই। সাড়ে সাতশো চাইছি। যদি নেন পাঁচশোতে ছেড়ে দেব। একশোটা বই একসঙ্গে কোথায় পাবেন? আর কনডিশনটা তো দেখোর মতো। একদম ব্র্যান্ড নিউ।’’
‘দেব’-টা দোকানদার উচ্চারে করল, ‘দোবো’। ‘দোবো’! উত্তর কলকাতার লোক গোলপোর্কে ব্যবসা করছে! হতেই পারে।
চমন না-চেয়েও লোকটার মুখটা দেখতে গেল। বোধ হয় চিনতে পারল লোকটাকে। এবং তখনই সে ভোবল, তাকে আর কেউ চিনতে পারে নো।
মিতুল তুতুলের হাত থেকে সেটটা নিল এবার। উল্টেপাল্টে দেখছে। আবার তুতুল নিল। এবার মিত্রা হাতে তুলে নিল সেটটাকে। নীল আর কালো রেক্সিনে মোড়া ঝকঝকে দেখতে একশোটা অমর চিত্র কথা-র সেট। মিত্রার হাত ছেকে যাদেখছে চমন। প্রথম গল্প হল ‘মোলবিকো’। ইংরেজি ভারশন। চমনের মেয়েরা ইংরেজিটাই ভোল শিখেছে। বাংলো জানে, পড়ে, সব দিক। কিন্তু ইচ্ছে করে বাংলো বই হাতে তুলে নেয়, এমনটা চমন দেখেনি। ওর ইংরেজিতেই স্বচ্ছন্দ। তবে
একটা দিক, চমনের মেয়েদের চমন এমন কোনও আহ্লাদ দিয়ে মানুষ করেনি যে, ইংরেজিতে সড়গড় বললে মনে হবে চমনের মেয়েরো ছোট ছোট পাশ্চাত্য পোশোক পরে, ফটর ফটর করে ইংলিশ বলে, কথায় কথায় ইংলিশে সোয়্যার করে, পিৎজ়া-বার্গার খায়, বা তাদের পাশ্চাত্য দেশের ছেলেমেয়েদের মতো অ্যাটিটিউড আছে, বাবা-মার মুখে মুখে উত্তর দেয়, কাঁধ ঝাঁকায় ইত্যাদি! না, এ সব কিছুই তার মেয়েরা করে। চমন ভীষণ স্ট্রিক্ট বাবা। বৌ মিত্রাও তাকে ভয় পায়। ফলে মিত্রাও মেয়েদের ব্যাপারে তার নির্দেশ অমান্য করার সাহস দেখায় না। কোথা থেকে শুরু করে চমন এখন কোথায় উঠেছে, সেটা ভেবে দেখার মতাে বিষয়! ঢাকুরিয়ার একটু ভেতর দিকে ফ্ল্যাট কিনেছে। গাড়ি কিনেছে। ভাল টাকাপয়সা জমিয়ে ফেলেছে। তেইশ বছর বয়সে চাকরিতে ঢুকেছিল। এখন সে কাঁটায় কাঁটায় পঞ্চাশ। ইন ফ্যাক্ট, আজই তার জন্মদিন। এবং এই সময়ের মধ্যে এতটা সফল হওয়ার কথা সে কদাচ ভাবেনি। অথচ পা মাটিতে রেখে চলে চমন। আর পরিবারকে সেই ভাবেই চালায়। ফলে তার মেয়েরা ট্যাঁশ হয়নি। বৌও বৌয়ের মতাে। রয়েছে। একটু দাবিয়ে রেখেছে সে ওদের, বলা যায়। জিনস-টপ পরতে দেয়নি মিত্রাকে। মেয়েরা পরে। তবে ওই, ঠিকঠাক রুচিসম্মত ভাবে। মিতুল এখন চোদ্দো। তুতুল বারাে। হয়তাে তার শাসনের ঠেলাতেই দু’জনেই একটু সঙ্কুচিত হয়ে থাকে। যৎসামান্য জড়ােসড়াে হয়তাে-বা অনেকটা চল্লিশ বছর আগে তার দেখা কিশােরীদের মতাে। মেয়েদের কোলকুঁজো ভাবটা সে দেখেও দেখে না।
এ রকমই সে চায়। তার বৌ, মেয়েরা একটু মুষড়ে থাকে, এটা তার কাছে বলতে গেলে। প্রশান্তিময়। এই কন্ট্রোলটা চলে গেলে, হঠাৎ করে এরা সব উত্তেজিত হয়ে হট্টগােল করলে, প্রগৰ্ভতা দেখালে, চনমন করে উঠলে, এমনকি খুব আনন্দিত, তৃপ্ত, উৎফুল্ল হয়ে উঠলেও তার। মাথাটা ঘেঁটে যায়, সে রেগে যায়, সে কনফিউজড হয়ে যায়। তখনই সে চেঁচামেচি করে, ধমকায়, শাসন করে সবাইকে, জোরে জোরে দরজা বন্ধ করে, এক-আধ বার বাসনকোসন... চড় থাপ্পড়! মিত্রাকেও!
বিয়ের জাস্ট ছ'মাস পর এক বার। মিত্রার বাপের বাড়ি থেকে লােকজন এসেছিল। রবিবার দিন। দুপুর থেকে খালি কথা, খালি গালগল্প, গান, পাগলামি, চব্যচোষ্য খ্যটিন। আনন্দের হাই টাইড যাকে বলে। অসহ্য, অসহ্য লাগছিল চমনের। এক বার সে নিজেদের শােওয়ার ঘরে গিয়ে রাগের চোটে দরজার পর্দা টান মেরে পেলমেট-সহ খসিয়ে ফেলল। ভাগ্যিস ধরে নিয়েছিল, নইলে শব্দ-টব্দ হত, সেই নিয়ে আবার নাটক। সে চেষ্টা করেছিল রাগ কন্ট্রোল করতে। রাত বারােটায় মিত্রার দিদি, দিদির বর, বােন, দাদা, দাদার বৌ, বাচ্চারা বেরােল বাড়ি থেকে। মিত্রা তখনও। মশগুল হয়ে আছে। গুনগুন করে গান করছে।
“জানাে তাে, দাদার ভীষণ বন্ধু হল গায়ক অরবিন্। খুব নাম করেছে বম্বেতে। দাদাকে নাকি জিজ্ঞেস করেছে আমার বিয়ে কেমন হল, সবাই বলে ওর নাকি আমার প্রতি একটা ক্রাশ...” মিত্রার মুখটা তখন এত চকচক করছিল! মেরুন বড় গােল স্টিকার টিপ, কানে ঝুমকো, হলুদ জরির শাড়ি সারা দিন ধরে শরীরে ধামসেছে, মিত্রার অঢেল চুলের চার পাক খোঁপা আধখুলে ঘাড়ের ওপর লটকাচ্ছে। মিত্রা নতুন কেনা ফ্রিজে পায়েস ঢুকিয়ে রাখছিল, তখনই ঘুরিয়ে চড়টা। মারল চমন মিত্রার গালে।
পায়েসের বাটিতে মুখটা ঢুকে গেছিল মিত্রার, নাকি পায়েসের বাটিটা মুখে ছিটকে এসেছিল— ক্রোধান্ধ চমন সেটা চোখে দেখতে পায়নি। আজ এত বছর পর সে সব মনেও নেই। মিত্রা দিন দশেক পর সেক্স করার সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে জানতে চেয়েছিল, “কী কারণে? কেন?” চমন মিত্রার বুকে ঠোঁট ঘষতে ঘষতে সম্পূর্ণ। আবেগবর্জিত গলায় বলেছিল, “এত হাহাহিহি ভাল লাগে না। এত গলে গলে আনন্দ করা দেখতে পারি না।”
মিত্রা শক্ত হয়ে গেছিল, “আনন্দ? অরবি না? আনন্দ?”
“হ্যাঁ। এত ফাজলামি, এত কাছা খুলে হইহুল্লোড় পছন্দ করি না।” মিত্রার কোমর কামড়াচ্ছিল চমন। সেই যে সিঁটিয়ে গেল মিত্রা, তার পর আর কোনও দিন তার সামনে হাসি, তামাশা, রঙ্গরসিকতা করেনি। টিভিও বন্ধ করে দেয় সে বাড়িতে থাকলে। স্বাভাবিক ভাবেই সে ভেবেছিল, নর্মাল থাকুক সকলে। মানে মেয়ে, বৌ। নর্মাল। যেমন সে বােঝে নর্মাল মানে।
মেয়েদের অবশ্য আলাদা করে কিছু বলতে হয়নি। বাড়ির পরিবেশটাই তাদের তৈরি করেছে। প্রাণহীন। অনর্গল কথা নয়। হাসাহাসি রেয়ারলি। একমাত্র যদি চমন নিজে হাসে তবেই। যেমন আজ সে একটু আলগা দিয়েছে। আজ তার জন্মদিন। একটা নাগাদ গাড়ি চালিয়ে ওদের নিয়ে পূর্ণদাস রােডের একটা রেস্তরাঁয় সে খেতে গেছিল। চাউমিন, ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন, প্রন সুইট অ্যান্ড সাওয়ার।
চমন এখন কেটেকুটে হাতে পায় দুই। লােন-টোন তার কিছু নেই। মাঝে মাঝে তাকে অফিস ট্যুরে যেতে হয়। গেলে পাঁচতারায় থাকে। সকালের ব্রেকফাস্টে যত স্প্রেড থাকুক, সে দুটো ইডলি খায়। ক’টা বাদাম খায়। এক গ্লাস ফলের রস খায়। হয়তাে একটু কেক খেল। ব্যস। লাক্সারি জিনিসটাকে সে কাছ থেকে দেখেছে। দিল্লিতে তার বসদের জীবনযাপন দেখেছে। কিন্তু গত সাতাশ বছর ধরে নিজের পয়সায় চাইনিজ খেতে এলে সে চাউমিন, ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন, প্রন সুইট অ্যান্ড সাওয়ারের বেশি অর্ডার করেনি কখনও। সে কখনও মিত্রা, মিতুল, তুতুলকে জিজ্ঞেস করেনি, “কী খেতে চাও?” কখনও বলেনি, “নাও, কী অর্ডার করবে করাে।” সে ভেবেছে তার পরিবারের জন্য চারটে বিরিয়ানি, একটা মাটন চাঁপ, একটা শসা বাদে পেঁয়াজলঙ্কার স্যালাড, চারটে কোল্ড ড্রিঙ্ক, তিনটে ফিরনিই যথেষ্ট। সে শরীরটা সােফায় এলিয়ে দিয়ে মিত্রাকে বলেনি, “তুমি তন্দুরি চিকেন নাও। এত ভালবাসাে।” মিতুল হয়তাে বলেছে, “ককোরি কাবাবটা দারুণ খেতে।”
সে বলেছে, “কোথায় খেলি?” “সিমলির জন্মদিনে।”
সে বলেনি, তা হলে ককোরি কাবাব অর্ডার কর!”
এবং সে পয়সা দিয়ে কেনা খাবার কখনও হুল্লোড় করে খেতে দেয়নি ওদের। উস, হাস! কী দারুণ! কী ঝাল! আহ, মুখে গলে গেল! যা ভাল লাগছে না! তােমারটা থেকে আমাকে একটু দাও! একটু টেস্ট করে দ্যাখাে, স্বর্গীয়! আর-একটা অর্ডার করাে! আর-একটা! না, , আমার আর-একটা কোকা কোলাই চাই, চিলড!— তারা চুপচাপ খেয়েছে সবাই। আজও চুপচাপ খেয়েছে। চাউমিন আর ওই সব। সেই যে শুভাশিসদা কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে হাতিবাগানের একটা রেস্তরাঁয় নিয়ে গিয়ে তাকে খাইয়েছিল। খেতে খেতে তার মনে হয়েছিল সে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। ভাললাগার এক-একটা অনুভূতির সঙ্গে স্থির হয়ে খেয়ে চলার যুদ্ধ। হচ্ছে। সে ভাল খাবারের সঙ্গে ঘিরে ধরা সেই অনুভূতির যুদ্ধে মাতালের মতাে হয়ে গেছিল। আসলে তার মনে হয়েছিল অনেক খায়। আরও অনেক খায়। কত বছর আগের কথা। সব মনে আছে। স্বাদকোরক মনে রেখেছে, ভাল খাবার সে সেই প্রথম খেয়েছিল। মাকে এসে বলেছিল সব। মা অবাক হয়ে শুনেছিল। তার পর আশীর্বাদ করেছিল এই বলে, “যেন রােজ এমন খেতে পাস।”
আজ একটু ঢিলেঢালা ছিল তার মেজাজ। সেটা থাকলে ওরা বুঝতে পারে। ওরা ওটা লুফে নেয়। একটা মানুষের মন, মেজাজ তার পেশি থেকে প্রতিফলিত হয়। মুখের পেশি। শরীরের পেশি। ওরা বুঝে নিলেই এ রকম কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলে। যেটা এখন ঘটছে। রেস্তরাঁ থেকে বেরিয়ে গাড়ির দিকে হেঁটে যেতে যেতে সামনে পড়ে গেছে বইয়ের দোকানগুলাে। মিতুল, তুতুল, মিত্রার গালগুলাে দেখছিল চমন। তার দুম করে রাগ হয়ে গেল।
মিত্রা এক বার তার দিকে তাকাল, তার পর বলল, “তােদের তাে এগুলাের মধ্যে বেশ ক’টা আছে।”
“কোথায়? পাঁচ সাতটা হবে!” বলল তুতুল।
মিতুল বলল, “আমি দেখেছি। ঠিক আটটা আমাদের আছে। বাকি সব নতুন। মা, এত ভাল কনডিশন আর পাব না মা।”
“নিবি?” বলল মিত্রা।
“নিয়ে নিন বৌদি। এত সস্তা। পাঁচ টাকাও পড়ছে না পার বই।”
তুতুল, মিতুল, মিত্রা, দোকানদার– পরস্পর কথা বলছে। আজ মনে হচ্ছে হঠাৎই ওরা তাকে ভুলে গেছে। সে কিছুক্ষণ চেষ্টা করল চুপ করে দেখে যাওয়ার। তার মধ্যেই দেখল মিত্রা ব্যাগ। খুলছে। নতুন ব্যাগ। চমনই কিনে দিয়েছে ক’দিন আগে। কোনও কিছুর অভাব সে রাখেনি ওদের। চমন আর পারল না, বলে উঠল, “তােমাদের লজ্জা করছে না? পাঁচশাে টাকা বার করছ ব্যাগ খুলে? আমাকে জিজ্ঞেস করেছ?”
মিত্রা সঙ্গে সঙ্গে সাদা হয়ে গেল। মিতুল আর তুতুলের লাল হয়ে গেল গাল।
“না, মানে, ওরা গ্রাফিক নভেল...”
“সব চাই না তােমাদের? সব চাই? এই তাে রেস্তরাঁয় খেলে। খাবার হজমও হয়নি। এখনই?”
“প্লিজ বাবা, বাড়ি গিয়ে বােলাে,” মিতুল কঁকিয়ে উঠে বলল।
তুতুল পিছিয়ে গেল কয়েক পা। মিত্রা বলল, “না মানে, আসলে...”
“হ্যাঁ! আসলে মানে? কী আসলে? খালি পয়সা ওড়াবে। এটা ওটা সেটা। একটা হলেই আর-একটা।”
“একটা শখ করে...।”
“তােমাদের শখ মেটাতেই তাে আমি আছি। আমি কী করছিটা কী? তােমাদের প্রতিপালন করছি, তােমাদের আগলাচ্ছি, তােমাদের শখ মেটাচ্ছি।”
“সামান্য একটা কারণে তুমি এত কথা বলছ? চলাে, বাড়ি ফিরি। অনেক হয়েছে আনন্দ,” মিত্রার চোখে জল, “নাহ। আর পারছি না। আর সম্ভব নয় এই অপমান সহ্য করা।”
হঠাৎই দোকানদার লােকটা তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল, “তুই খালপাড়ের চমন না? অতনু বিশ্বাস তাের কাকা ছিলেন না? নকশাল অতনু বিশ্বাস? তাের বাবার নামটা... মনে পড়ছে না। আমাকে চিনতে পারছিস? মাধব চাকী। আমাকে চিনতে পারছিস না চমন? আমার দিদির কাছে পড়তে আসতিস, মনে নেই? বিনা পয়সার টিচার ছিল আমার দিদি তল্লাটের গরিব ছেলেপিলের।
বকুলদি, মনে পড়ছে?”
থতমত ভাবটা কাটিয়ে চমন বলল, “হ্যাঁ চিনতে পেরেছি। ভাল আছ?”
“আমার ক্যাসেটের দোকান ছিল একটা।”
“হ্যাঁ। ফুটপাথের ক্যাসেটের দোকান।”
“মনে রেখেছিস। সবই তাে ভাল এখন। সে দিন আর কারওই নেই যা দেখি শুনি। পুরনাে কত জনের সঙ্গে দেখা হয়! কে বলবে এক দিন তারা অনেকেই রাতে মুড়ি চিবিয়ে শুয়ে পড়ত!”
“হ্যাঁ। আমার অবশ্য দেখা হয় না কারও সঙ্গে।”
চমন বলতে চাইল, ‘আমার তাে আর রাস্তার ওপর বসে খদ্দের সামলাতে হয় না! তাই সবার সঙ্গে দেখা হয় না। কিন্তু বলল না। সে অহঙ্কারকে মনের চৌকাঠ পার হতে দেয় না।
মাধব বলল, “তুই ভেবেছিলি তােকে চিনতে পারব না। তাই না চমন?”
“সত্যি, কী করে চিনলে?”
সে দেখল মিত্রা আর মেয়েরা ফুটপাথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। আর-একটু এগিয়ে গেলে তারা গলার আওয়াজ ওরা শুনতে পাবে না। চমন নিশ্চিন্ত হল। এ বার সে দরকার হলে মন খুলে কথা বলতে পারবে মাধবের সঙ্গে। মাধব একটা সিগারেট ধরাল। টান দিল ভুসভুসিয়ে, “তাের মা যখন হসপিটালে পড়ে ছিল সেই ছ'মাস, আমি গেছি তাে দেখতে। বকুলও গেছিল এক বার। তুই টিনের টুলে বসে থাকতিস চমন। দিন রাত। আমাদেরও তখন খাওয়া জুটত না।”
“হুম। বসে থাকতাম। মার কোনও চিকিৎসাই হয়নি। আমি কিছু করতে পারিনি। তখন সকালে খেতাম গােয়ালাবাড়ির বাসি রুটি। রাতে ঘোঁতনের জেঠিমা ভাত দিতেন। জল-ঢালা ভাত। মা হসপিটালে। আমার পরীক্ষা। আমি হসপিটালে বসে পড়তাম মাধবদা।”
“তখন তাের মুখে একটা কান্না মাখামাখি হয়ে থাকত। তাের মুখ থেকে ওই ছাপটা এখনও যায়নি রে চমন।”
“তাই চিনতে পারলে।”
বইটা একটা প্যাকেটে ভরে দিল মাধব, “বইটা নিয়ে যা চমন। দাম দিলে দে। না দিলে না দে। কিন্তু নিজেকে আর শাস্তি দিস না। যা, যা। দ্যাখ। কোথায় গেল বৌমারা। নর্মাল হ’ চমন। এত বছর হয়ে গেছে। এখনও নর্মাল হলি না!”
চমন অসাড় হাতে মানিব্যাগ বার করে সাড়ে সাতশাে টাকাই দিল মাধবের হাতে। তার পর সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল মিত্রা, মিতুলরা যে-দিকের রাস্তায় বেঁকে গিয়ে চোখের বাইরে চলে গেছে, সে দিকে। সে ভাবছিল নর্মাল শব্দটার কথা, এত কাল সে নর্মাল বলতে বুঝেছিল মায়ের মড়া শােক। শােকের পরে সাদা পর্দা ঝুলে থাকা দুটো শূন্য চোখ। আর কিছু না।
