ঈশ্বরের অলৌকিক সন্তানেরা book pdf download - নন্দিনী নাগ Iswarer Aloukik Santanera pdf by Nandini Nag
“ডেলিভারি কোথায় হয়েছিল আপনার? হাসপাতালে?”
উত্তরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল বিন্দি। “নর্মাল ডেলিভারি না সিজার?” রুপুর সমস্যার সঙ্গে এই প্রশ্নগুলাে কী ভাবে যুক্ত, সেটা ঠিকমতাে না বুঝতে পারলেও ডাক্তারবাবুর প্রশ্নগুলাের পর পর জবাব দিয়ে যাচ্ছিল বিন্দি।
রুপুকে অনেক সময় নিয়ে খুঁটিয়েখুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন ডাক্তার দত্তরায়। তার পরেও ওর সমস্যা নিয়ে। উনি কোনও কথা বলেননি। এখন বাচ্চাটি ‘সিজারিয়ান বেবি’ জানার পর বিড়বিড় করলেন তিনি, “তা হলে এমন তাে হওয়ার কথা নয়!”
বিন্দি আর শ্যামল উদ্বিগ্ন মুখে তাকিয়ে ছিল ডা. দত্তরায়ের মুখের দিকে। একটু থেমে ডা, দত্তরায় আবার বললেন, “এই বাচ্চার ব্রেনের কিছুটা অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। তাই ওর শরীর ঠিক মতাে কাজ করতে পারছে না। ঠিক কতটা ড্যামেজ হয়েছে, কোন অংশটা ড্যামেজ হয়েছে, সেটা জানার জন্য কয়েকটা পরীক্ষা করাতে হবে। সেই পরীক্ষাগুলাে আমি প্রেসক্রিপশনে লিখে দিলাম, করিয়ে নিয়ে আসুন। তার পর আমরা আলােচনা করব কী ভাবে কী করা যায়।”
“আমার ছেলেটা কি আর ভাল হবে , ডাক্তারবাবু?” বুক ফেটে বেরিয়ে আসা কান্নাটাকে কোনওমতে চেপে রেখে জিজ্ঞেস করল বিন্দি।
বিন্দির কষ্টটা যে ডাক্তারবাবু বুঝতে পারবেন না, এমন তাে নয়!
তিনি নরম স্বরে বললেন, “দেখুন, একটা জিনিস আগে আপনাদের ভাল করে বুঝতে হবে। গাছের ডাল ভেঙে ফেললে সেখান থেকে আবার নতুন ডাল গজায়। আমাদের। কোথাও কেটে গেলে আবার সেটা ঠিক জুড়ে যায়, গত হয়ে গেলে মাংস-চামড়া। গজিয়ে ভরাট হয়ে যায়। তার কারণ এ সব। জায়গায় নতুন করে কোষ তৈরি হয়। কিন্তু আমাদের ব্রেন যে-সব কোষ দিয়ে তৈরি, সেগুলাে এক বার যদি মারা যায়, তবে আর নতুন করে জন্মায় না। তাই আপনার ছেলের ব্রেনের অলরেডি যেটুকু ক্ষতি হয়ে গেছে, সেটা যে আর ঠিক করা যাবে না, এটা মেনে নিয়েই আমাদের এগােতে হবে। আপনাদের দু’জনকেই মন শক্ত করতে হবে।”
“কিন্তু আমার ছেলেটার এ রকম কেন হল, ডাক্তারবাবু? আমার কি শরীরে কোনও দোষ ছিল?”
প্রায় তিরিশ বছর ধরে এই পেশায় আছেন ডা. দত্তরায়। তিনি জানেন, এই দেশের মানুষ এখনও পর্যন্ত সন্তানের কোনও সমস্যার জন্য মা-কেই দায়ী করে। এমনকি মা’র যদি চোখে পড়ার মতাে কোনও অপরাধের খোঁজ না পায়, তবে পূর্বজন্মকেও টেনে আনতে কসুর করেন না। খুলে বসে তার আগের জন্মের পাপের খতিয়ান। আর সেইসব মায়েরা অপরাধের দায়ভারে গুটিয়ে যায়। ক্রমশ লুকিয়ে ফেলে নিজেদের অস্তিত্ব। তাই এই অল্পবয়সি মা-র মনে যাতে কোনও ভুল ধারণা না জন্মায়, সেই ব্যাপারে সচেষ্ট হলেন ডা, দত্তরায়। কারণ মা যদি অবসাদগ্রস্ত হয়ে যায়, তবে সবচেয়ে ক্ষতি হবে এই শিশুটির, যার কিনা সব সময়ই অন্য আর পাঁচটা বাচ্চার চাইতে অনেক বেশি পরিচর্যার প্রয়ােজন।
“নিজেকে শুধু-শুধু দায়ী করবেন না, কারণ এখানে আপনার কিছুই করার ছিল না। বাচ্চার জন্মের পর ব্রেনে অক্সিজেন। ঠিকমতাে না-পৌছলে কিংবা মাথায় কোনও ভাবে চোট পেলে এমন হতে পারে। আমার বলতে খারাপ লাগছে, কিন্তু এটাই সত্যি যে, ডেলিভারি করানাের সময় ডাক্তার-নার্সদের আরও একটু যত্ন নিয়ে কাজ করা উচিত ছিল!”
দোষটা কি ডাক্তারবাবুর ছিল? নাকি নার্সদের? নার্সিংহােমে সাদা পােশাক পরা যে-মহিলারা নার্স হিসেবে ডিউটি করছিল, তারা কি সত্যি-সত্যিই ডিগ্রি পাওয়া নার্স ছিল? নাকি আয়া হিসেবে কাজ করতে ঢুকে, সময়ের দাবি আর রােজকার মাজাঘষাতে আয়ার প্রচ্ছদ খসিয়ে ফেলে নার্স পদে।
এ সব প্রশ্নগুলাের কোনও উত্তরই নেই মিতুর কাছে। উত্তর খোঁজার ইচ্ছেও নেই। ওর কী হবে এখন এই সব পুরনাে কাসুন্দি ঘেঁটে! সময়কে তাে আর পিছনের দিকে। হাঁটানাে যাবে না, ফলে শুধু-শুধু সময় আর শক্তি দুইয়েরই অপচয় হবে। পরিচিত অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিল, “নার্সিংহােম আর ডাক্তারের নামে মামলা ঠুকে দাও।” কিন্তু ওই পথে হাঁটতে মন সায় দেয়নি মিতুর, তাই অশােককেও নিষেধ করেছে।
“কী হবে বল মামলা করে? কেবল এক গাদা টাকা আর সময় নষ্ট। যদি শেষ পর্যন্ত আমরা জিতেও যাই, তাতেই বা কী হবে? কিছু টাকা পাব ক্ষতিপূরণ হিসেবে, এই তাে? কিন্তু ক্ষতি কি আমাদের সত্যি-সত্যি পূরণ হবে তাতে? আমার তাে মনে হয়, ও সব চিন্তা বাদ দিয়ে আমাদের এখন সমস্ত মনােযােগ মেয়ের দিকে দেওয়া উচিত।”
