কার মিলন চাও pdf download - বিপুল দাস Kar Milan Chaw pdf by Bipul Das Book pdf link
সাধন হালদারের অনুশীলনের সময় তার ঘরে প্রবেশ করা বারণ। সে নিজেই দরজার উপর নোটিশ সেঁটে দিয়েছে ‘রেওয়াজের সময় শিল্পীকে বিরক্ত করিবেন না'। মেয়েলি ছাঁদের হাতের লেখা সাধনের। ভোরবেলায় ছ'টা থেকে আটটা, সন্ধেয় সাতটা থেকে ন'টা। পাড়ার শ্রীশ্রীজগদ্ধাত্রী পূজা কমিটির সেক্রেটারি বাদল ঘোষ কথা দিয়েছে, এবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সাধন হয়তো সুযোগ পাবে। বাদল ঠিক কথা দিচ্ছে না, কিন্তু সে তার যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।
সাধনের মুশকিল হল, সে হাতে একবার মাইক্রোফোন পেলে কিছুতেই ছাড়তে চায় না। বছর দুয়েক আগে নবপল্লীর বিজয়া সম্মিলনীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার হাত থেকে মাইক্রোফোন কেড়ে নিতে হয়েছিল। সেটাই ছিল তার শেষ অনুষ্ঠান। তার পর থেকে কেউ আর তাকে ডাকছে না। প্রথম যে বার সে মঞ্চে সুযোগ পেয়েছিল, তাক লাগিয়ে দিয়েছিল শ্রোতাদের। প্রথমে উইংসের আড়াল থেকে সে দু'কলি গায়, তারপর হাতে মাইক্রোফোন নিয়েই গাইতে গাইতে মঞ্চে ঢোকে। পাবলিক হাততালিতে ফেটে পড়ে। হালদারবাড়ির ছোটছেলে সাধন হুবহু লতার গলায় গাইছে। চোখ বুজে শুনলে কে বলবে লতা মঙ্গেশকর নয়। চোস্ত পাজামা আর কাজকরা পাঞ্জাবি পরে, চোখে হালকা কাজলের রেখা, মঞ্চে ঘুরে-ঘুরে লতাকণ্ঠী হয়ে গাইতে থাকে, ‘সাত ভাই চম্পা জাগো রে জাগো রে’। ‘আকাশপ্রদীপ জ্বলে ... গান শেষ হলে মিষ্টি করে হাসে। তার মঞ্চে ঘুরে-ঘুরে হাঁটার ধরনে নারীসুলভ কমনীয়তা, লাবণ্য থাকে। তারপর ধরে, ‘দিদি তেরা দেবর দিওয়ানা'। উল্লাসে ফেটে পড়ে পাবলিক। সিটি দেয়। পর্দার আড়াল থেকে সে যখন গান শুরু করেছিল, সবাই ভেবেছিল চমৎকার গলা তো মেয়েটির। একটু বাদে সাধন হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে স্টেজে ঢুকলে দর্শকেরা প্রথমে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়, তার পর হাততালিতে ফেটে পড়েছিল। এর পর থেকে বাইরে ডাক পেতে শুরু করে সাধন হালদার।
বর্ষাকে নিয়ে শম্পা এসেছিল জলপাইগুড়ি থেকে। এ বাড়িতে ঢুকেই প্রথমে জিজ্ঞেস করেছিল, “সাধনদা কোথায় পিসি?”
“শুনতে পাচ্ছিস না, দরজা বন্ধ করে মেয়েদের গলায় গান প্র্যাক্টিস করছে। আজকাল আবার নতুন কায়দা ধরেছে। একাই দু'রকম গলায় গান করে। এক বার ছেলেদের গলায়, এক বার মেয়েদের গলায়। ডুয়েট। শুধু মেয়েদের গান নাকি বাজারে আর চলছে না। কিশোর- লতাই বেশি চলছে। এ মেয়েটা কে রে শম্পা? কী মিষ্টি চেহারা!” “ও আমার বন্ধু, বর্ষা। ময়নাগুড়ি কলেজে পড়ায়।” “যা, তোরা বাইরের ঘরে বোস। আমি আসছি।”
“না না পিসি, তোমাকে কোথাও যেতে হবে না। বড়বৌদি ঘরে আছে না?”
“সারাদিন কম্পিউটারে ইস্কুলের ক্লাস নেয়। কোথায় আর যাবে।”
“ছোটু আর মিঠু? ওদেরও তো অনলাইন ক্লাস। এটা নাও, তোমার পছন্দের জিনিস। দিলুদার দোকানের ক্ষীরদই। আর এই তোমার জর্দার কৌটো। জর্দাটা এ বার কমাও পিসি। যা শুনি মাঝে-মাঝে...”
“এ সব আবার আনতে গেলি কেন? রাখ টেবিলে। একটা কথা বলি শম্পা তোকে। তোর কথা হয়তো সাধন শুনতে পারে। ছোটবেলা থেকে এক সঙ্গে বড় হয়েছিস। ওকে এ সব গানটান ছেড়ে কোথাও একটা চাকরির চেষ্টা করতে বল না! এসব করে কত বড় আটিস হবে, বল! ও সব মেয়েলি গলার গান, আজকাল লোকজন হাসাহাসি করে। পথেঘাটে ওকে দেখলেই আড়াল থেকে মেয়েলি গলায় গান করে। তুই ব্যাটাছেলে, দাপটে থাকবি। তা নয়, নামেই ছেলে, কাজে মেয়েরও অধম। কী বলব তোকে, তোর বন্ধু রয়েছে, তার সামনে বলতে লজ্জাও করে। পাড়ার ছেলেরা নাম দিয়েছে সাধনা।”
শম্পা হাসল। এ ভাবে যে বেশি দিন চলবে না, সাধনকে বলে লাভ নেই। লোকে গান নয়, এক ধরনের মজা পাচ্ছে, সেটা সাধনের মাথায় ঢুকবে না। তার ধারণা শিল্পী হিসেবে সে বেশ নাম করে ফেলেছে। এ রকম গান করে সে কত দূর উঠবে! সাময়িক হুজুগে লোকে শুনছে। নতুন খেলনা পেলে বাচ্চারা যেমন কিছু দিন খেলে তার পর হারিয়ে ফেলে, সাধনও হারিয়ে যাবে।
“পিসি কিছু মনে কোরো না। দোষ তোমারও আছে। আমরা তো ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। পরপর দুই ছেলের পর খুব মেয়ের শখ ছিল তোমার। সাধনদাকে মেয়েদের ফ্রক পরিয়ে রাখতে, কাজল পরাতে, কপালে টিপ পরাতে। চুল কাটাতে না। বড় চুলে চুড়োখোঁপা বেঁধে দিতে। সাধনদা নাকি তোমার রাধারানি। ওর বয়সি ছেলেরা যখন ধুলোবালি মেখে রাস্তায় বা মাঠে খেলছে, কাদা মাখছে, মারামারি করছে, সাধনদা তখন মেয়েদের সঙ্গে রান্নাবাটি খেলত। ওকে কোনও দিন বন্দুক কিনে দাওনি, দামি-দামি পুতুল কিনে দিতে। হাঁটাচলা, কথা বলার ভঙ্গিতে মেয়েলিপনা দেখেও পাল্টানোর চেষ্টা করোনি। এখন আর ওকে ব্যাটাছেলে কেমন করে বানাবে?”
চুপ করে রইলেন শম্পার পিসি। শম্পাকে উত্তর দেওয়ার মতো কিছু নেই। সত্যিই সাধনকে মেয়ে সাজিয়ে রেখে তার এক রকম সুখ হত। হারাধন, বাঁধনের পর আবার ছেলে হলে মনে-মনে ভাবতেন তার দুই ছেলে, এক মেয়ে। ভগবান ভুল করে সাধনের শরীরটা ছেলেদের মতো করে দিয়েছে। সে ভাবেই তাকে বড় করে তুলেছেন। আস্তে-আস্তে দেখলেন তার স্বভাব, চলাফেরা, কথা বলার ভঙ্গি ক্রমশ মেয়েদের মতো হয়ে যাচ্ছে। চেহারাতে পুরুষালি ভাবটাই নেই। আত্মীয়স্বজন এলে তাকে নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করত। “নিলু, তোর ছোটছেলেটা একদম মেয়েদের মতো হয়েছে,” বলত। সেটা নিলুপিসিও বুঝতে পারতেন। এক রকম ভয় করে উঠত বুকের ভেতরে। সাধনের মেয়েবন্ধুরা আসত বাড়িতে। তাদের সঙ্গে স্কুলে যেত। দরজা বন্ধ করে গল্প করত। সবাই মিলে নখে নেলপালিশ লাগাত। বড়ছেলে হারাধন একদিন তার বাবরি চুলের গোছা বাড়িতে নাপিত ডেকে ছোট করে কেটে দিলে সে কী কান্না সাধনের।
“হ্যাঁ রে শম্পা, আমারই ভুল। ওর মনটাই পাল্টে গেছে। মাঝে- মাঝে মনে হয় ছেলেদের শরীরটাই ওর এখন শত্তুর। না পুরোপুরি ব্যাটাছেলে, না হয়েছে পুরো মেয়ে।”
“হ্যাঁ পিসি, এটা একটা অসুখ, কিন্তু অস্বাভাবিক কিছু নয়। আসলে কিছু হরমোনের খেলা। থাক, ও সব তুমি বুঝবে না।”
“আমার আর কিছু বুঝতে ইচ্ছেও করে না। তোর কথা শোনে, দ্যাখ, এসব অমুকণ্ঠী-তমুককণ্ঠী না হয়ে নিজের গলায় গান গাইতে পারে কিনা। গলায় ভাল সুর আছে ওর। হারাধন বড় হেনস্থা করে ওকে। অত বড় ছেলের গায়ে হাত তোলে। আমি কিছু বলতে গেলে আমাকেও প্রায় মারতে আসে। আমার জন্যই নাকি ম্যাদামারা হয়েছে। ছুটিছাটায় বাঁধন এলেও ওর পেছনে লাগে। কোনও সময় ‘সাধন' বলে ডাক দেয় না। 'এই যে সখী' বলে ডাকে। আজ পর্যন্ত কোনও দিন ভাই বলে ডাকেনি। আমি বুঝতে পারি, ওরা দু'জনই ঘেন্না করে ওকে। দরজা বন্ধ করে চুপচাপ কাঁদে ছেলেটা। আমার ভয় করে কোন দিন না কোনও অঘটন ঘটিয়ে বসে। হারাধন তো হাবেভাবে বলেই দিয়েছে ওর নিজের ব্যবস্থা যেন নিজে করে নেয়।”
বিপুল দাসের কার মিলন চাও Milan Chaw pdf download করুন এখান থেকে।
Tags
Various
